

বিশেষ প্রতিনিধিঃ
নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান আলী হায়দার শামীম ওরফে পিজা শামীমের ছেলে জুবায়ের বিন হায়দার বর্তমানে জাতীয় সংসদের অভ্যন্তরে কাঠের কারখানা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। যার দায়িত্ব হচ্ছে জাতীয় সংসদের প্লেনারি হলের ভেতরের আসবাবপত্রসহ সকল আসবাপত্র সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ। দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে যেখানে এসআইএস-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী জাহিদুর রহিম জোয়ার্দার দাবি করেছেন, টেবিল চাপড়ানোর ফলে কানেকশন লুজ হওয়ার কারনে সাউন্ড সিস্টেমে সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেই টেবিলের দায়িত্বটিও পিজা শামীমের ছেলের হাতে।
গণপূর্তের কাঠের কারখানার দায়িত্ব এতোটা স্পর্শকাতর যে, সংসদ ভবনের মূল অধিবেশন কক্ষ বা প্লেনারি হলের সবচে’ সেনসেটিভ স্থাপনাও তার নিয়ন্ত্রণাধীন। আওয়ামী লীগ আমলে ৩০তম বিসিএসএ চাকরি পাওয়া জুবায়ের বিন হায়দার আওয়ামী লীগ আমলে নারায়ণগঞ্জের গণপূর্তের ইএম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। নিজেই সকল ঠিকাদারী কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন। যেখানে নিজেই ছিলেন প্রকৌশলী ও নিজেই ঠিকাদার। নারায়ণগঞ্জের নাসিম ওসমান, সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমানের মটর সাইকেল বাহিনীর প্রধান পিজা শামীমের ছেলে যেকোন মুহুর্তে জাতীয় সংসদের অভ্যন্তরে বড় ধরনের নাশকতা করতে সক্ষম।
এমন কট্টর আওয়ামী লীগ ব্যাকগ্রাউন্ড এবং চিহ্নিত পলাতক সন্ত্রাসীর ছেলেকে সংসদ ভবনে পোস্টিং দেওয়ার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেন গণপূর্তের চলতি দায়িত্বের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী। গত ২৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তর জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় উগ্রবাদীদের হামলার শঙ্কা নিয়ে সারাদেশে সতর্কতা জারি করেছে। সেখানে পলাতক সন্ত্রাসী পিজা শামীমের ছেলে জুবায়ের বিন হায়দারের পোস্টিং থাকা নিয়ে শঙ্কা আরো জোরদার হয়েছে।
অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে এক প্রভাবশালী জামায়াত নেতার জোর সুপারিশে এবং বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কুয়েটের ছাত্র হওয়ায় জুবায়েরের প্রতি দুর্বলতা ও ‘কুয়েট কোরামে’র কারনে জাতীয় সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সন্ত্রাসী পিজা শামীমের ছেলেকে পোস্টিং দেয়া হয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতের পরিচিতি ছাড়িয়ে নানা কৌশলে সংসদ ভবনের পোস্টিং টিকিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা করছেন এই জুবায়ের বিন হায়দার। একই সঙ্গে সংসদের জামায়াতের অফিসারসহ কিছু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে চলার চেষ্টা করছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে নগদ অর্থের লেনদেনও করছেন সন্ত্রাসী আলী হায়দার শামীম ওরফে পিজা শামীমের ছেলে জুবায়ের বিন হায়দার।
কে এই পিজা শামীম
‘পিজা শামীমে’র আসল নাম আলী হায়দার শামীম। নারায়ণগঞ্জের একজন বিতর্কিত ব্যক্তি, যাকে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং পুলিশ প্রায়ই ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তিনি মূলত নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, বিশেষ করে আজমেরী ওসমানের ‘ক্যাডার’ বা প্রধান সহযোগী হিসেবে পরিচিত। ২০২৩ সালের ১৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের বন্দরে জমি দখলের চেষ্টায় গুলিবর্ষণের একটি ঘটনা ঘটে, যেখানে একজন গুলিবিদ্ধসহ ১০ জন আহত হয়। এই ঘটনার পর পুলিশ শহরের মাসদাইর এলাকা থেকে পিজা শামীমকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে।
তাকে একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান হিসেবে গণ্য করা হয়, যারা জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং এলাকায় দাপট দেখানোর মতো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি জাতীয় পার্টির রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন এবং আজমেরী ওসমানের প্রয়াত নাসিম ওসমানের ছেলে ডান হাত হিসেবে কাজ করতেন। তার এই অদ্ভুত ‘পিজা শামীম’ নামটির পেছনে সম্ভবত পিজা ব্যবসার সাথে কোনো পুরনো সম্পৃক্ততা ছিল, তবে বর্তমানে তিনি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণেই বেশি পরিচিত যিনি জুয়ার আসরও চালাতো।
অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের স্ত্রীর নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান করে প্রায় শত কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয়ায় গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। তাকে লঘুদণ্ড দিয়েছে মন্ত্রণালয়। কিন্তু এই অনিয়মে সহযোগিতাকারী নির্বাহী প্রকৌশলী জুবায়ের বিন হায়দারকে প্রাইজ পোস্টিং দিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। বলা হচ্ছে, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে থাকা খালেকুজ্জামান কুয়েটের ছাত্র হিসেবে একটি ‘কুয়েট কোরাম’ চালু করেছেন। কুয়েটে পড়া সকলেই তার কাছে বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন। জুবায়ের বিন হায়দার কুয়েটের ছাত্র হওয়ায় ‘ইউনিভার্সিটির ছোট ভাই’কে ঊর্ধ্বতন সকল কর্মকর্তার মতামত উপেক্ষা করে গণপূর্ত কাঠের কারখানা বিভাগে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ দিয়েছেন। অথচ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ মন্ত্রণালয়ের তদন্তনাধীন রয়েছে।
‘কুয়েট কোরাম’ না ‘নাশকতার’ প্রস্তুতি?
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম আতিকের বিরুদ্ধে নিজ স্ত্রী কানিজ মুস্তারিন ও বন্ধু জাহিদুর রহমানের যৌথনামে ‘এ্যাড্রয়েট কনসালটেন্টস এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’ নামে ঠিকাদারী লাইসেন্স করে যে ১৬৭টি কাজ বাগিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে সেই কাজগুলোর মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ ২৩টি কাজ দিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী জুবায়ের বিন হায়দার। গণপূর্ত ইএম বিভাগের নারায়ণগঞ্জে দায়িত্বে থাকাকালে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারনে গণপূর্ত পিএন্ডডি জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর স্টাফ হিসেবে বদলি করা হয়েছিল।
হঠাৎ করেই গত ২৮ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর পদ থেকে কথিত পীর শামীম আখতারকে সরিয়ে মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে প্রথমে রুটিন দায়িত্ব এবং পরে চলতি দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সে সময়ে গণপূর্ত ইএম বিভাগের অনেকগুলো পদ বদলিযোগ্য ছিল। চতুর জুবায়ের বিন হায়দার সেই সুযোগে ‘ইউনিভার্সিটির বড় ভাই’ খালেকুজ্জামানের ‘কুয়েট কোরাম’ কাজে লাগিয়ে গণপূর্তের সবচে’ লোভনীয় কাঠের কারখানা বিভাগে পোস্টিং বাগিয়ে নেন। এ সময়ে জামায়াতের এক প্রভাবশালী নেতা জুবায়েরের জন্য জোর সুপারিশ করেন। এই বিভাগে প্রতি অর্থবছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার কাজ হয়ে থাকে। যা থেকে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার কমিশন পাওয়া যায় বলে প্রচলিত রয়েছে।
এদিকে আতিকের দুর্নীতির সঙ্গে নিজের নাম না আসার জন্য অনেক চেষ্টা তদ্বির করে সফল হয়েছে জুবায়ের বিন হায়দার। মন্ত্রণালয় আতিককে লঘুদন্ড দিলেও জুবায়ের বিন হায়দারকে কোন দণ্ড দেননি। গত ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরুর দিনে সাউন্ড সিস্টেমের বিপর্যয় হলে তা নাশকতা কি-না তদন্তের জন্য গঠিত কমিটিতে জুবায়ের বিন হায়দারকে সদস্য রাখা হয়েছে। জাতীয় সংসদের সার্জেন্ট এ্যাট আর্মস কমোডর আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিটিতে জুবায়ের বিন হায়দারের অন্তর্ভুক্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যিনি নিজেই সংসদ ভবনে নাশকতার সঙ্গে জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে তাকেই রাখা হয়েছে তদন্ত কমিটিতে। সার্জেন্ট এ্যাট আর্মস মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জুবায়ের বিন হায়দারের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক না করেই তাকে তদন্ত কমিটিতে সদস্য করেছেন না-কি তিনিও জুবায়ের বিন হায়দার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
এদিকে এনএসআই-এর পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভুইয়ার কাছে জুবায়ের বিন হায়দার সম্পর্কে রিপোর্ট করা হলেও তিনিও কোন ব্যবস্থা নেননি। এ অবস্থায় জাতীয় সংসদ ভবনে বড় ধরনের নাশকতার শঙ্কা যেখানে খোদ পুলিশ সদর দপ্তর করেছে সেখানে জুবায়েরের ভুমিকা কি হবে সে প্রশ্নই বার বার ঘুরে ফিরে আসছে।
আমি মাকে বলবো বাবা’কে তালাক দিতে
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত বিএফইউজে’র নির্বাহী কমিটির সাবেক এক সদস্য সাংবাদিক রিপোর্ট করার জন্য জুবায়ের বিন হায়দারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমি তো আমার বাবাকে পরিবর্তন করতে পারবো না। এটা আমার হাতে নেই। এখন মাকে বলতে পারি বাবাকে তালাক দিতে। তাতেও তো আমার পরিচয় মুছে যাবে না। ওই সাংবাদিক জাতীয় সংসদের সাংবাদিক লাউঞ্জে জুবায়ের বিন হায়দারের এমন বক্তব্যের বিষয়টি নিয়ে অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে হাস্যরস করেন।
কী বলেন প্রধান প্রকৌশলী?
এ ব্যাপারে প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। জুবায়ের যে সন্ত্রাসী আলী হায়দার শামীম ওরফে পিজা শামীমের ছেলে এ বিষয়ে তিনি জানতেন না। তিনি বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী লেভেলে কোন কর্মকর্তা বদলির ক্ষমতা এখন আমার হাতে নেই। সব বিষয়ে মন্ত্রী নির্দেশনা দেন। এ ব্যাপারে মন্ত্রী নির্দেশ দিলে অবশ্যই জুবায়েরকে সরিয়ে দেয়া হবে। তবে তিনি নিজ থেকে এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নিতে পারবেন না বলে জানান।

Reporter Name 






